‘যশোরের যশ খেজুরের রস’ প্রবাদ বাক্যটি বহুল প্রচলিত। ‘বউ ঠিলে ধুয়ে দে, গাছ কাটতি যাব/সন্ধ্যি রস আইনে জাউ রাইন্দে খাবো’—এমন কথার গান শীত এলেই যশোরের গ্রামাঞ্চলের মাঠেঘাটে শোনা যায়। শত শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে খেজুরের রস, গুড় ও পাটালি। শীতের পিঠা-পায়েস মানেই খেজুর-রস আর গুড়-পাটালির ব্যবহার।
শীত মৌসুমে যশোরের নাম শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে খেজুরের রস ও সুস্বাদু নলেন গুড়ের কথা। বাংলাদেশে শীত যেন যশোরের খেজুরের রস ছাড়া পূর্ণতা পায় না। শীত নামার সঙ্গে সঙ্গে যশোরের গ্রামগঞ্জে খেজুরের রস ও গুড়ের নানা পিঠা, ক্ষীর, পায়েসসহ আরও অনেক ধরনের সুস্বাদু খাবার বানানোর ধুম পড়ে। সেই গুড় ছাড়া পিঠার মৌসুম অসম্পূর্ণ, সেই রস ছাড়া শীতের সকালই যেন নিস্তেজ। তাই কথাই আছে—‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’। এ প্রবাদ বাক্যটি এই ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রসের দেশব্যাপী জনপ্রিয়তার একটি বড় উদাহরণ।
এ অঞ্চলের খেজুরগাছ ও রস সংগ্রহের ঐতিহ্য অনেক পুরোনো। যশোর অঞ্চলে খেজুরগাছ শুধু ফসল নয়, এটি ছিল স্থানীয় অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং খাদ্যরুচির অংশ। বহু আগে ব্রিটিশ শাসনামলে যখন আখের চেয়ে খেজুরের গুড় বেশি জনপ্রিয় ছিল, তখন যশোর থেকে নৌকা এবং গরুর গাড়িতে করে গুড় নিয়ে যাওয়া হতো কলকাতায়। ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, যশোরে একসময় খেজুরগাছ ছিল লাখেরও বেশি। গুড় উৎপাদন হতো মণকে মণ। বাণিজ্যের পাশাপাশি গাছিকে কেন্দ্র করে একটি সম্পূর্ণ পেশাজীবী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। এই গাছিরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে নিজেদের অভিজ্ঞতায় গাছ কাটার কৌশল, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির দক্ষতা অর্জন করেছে। তাদের ভাষায়, গাছিরা শুধু রস সংগ্রহ করে না, তারা গাছের সঙ্গে বন্ধন তৈরি করে। গাছ কাটা কোনো সাধারণ কাজ নয়; কখন কাটলে রস বেশি পাবে, কোন গাছের রস বেশি মিষ্টি হবে, কোনদিন গাছ বিশ্রামে থাকবে—এসব নিয়েই তাদের অভিজ্ঞতা।
খেজুরের রস সাধারণত দুই রকমের হয়ে থাকে—জিরন রস ও ওলা রস। গাছ কাটার পর প্রথম দিন যে রস সংগ্রহ করা হয় তাকে স্থানীয় ভাষায় জিরন রস বলা হয় আর পরবর্তী দুই থেকে তিন দিন ওলা রস সংগ্রহ করা হয়। জিরন রস দিয়ে সব থেকে সুস্বাদু দানাদার জিরন গুড় (নলেন গুড়) ও শক্ত পাটালি তৈরি করা হয়। পাটালি তৈরির জন্য একটি প্রক্রিয়া আছে, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘বীজ মারা’ বলা হয়। আর ওলা রস দিয়ে তৈরি হয় ওলা গুড় ও টক গুড়। স্থানীয়দের কাছে সব থেকে সুস্বাদু রস হলো ‘সন্ধি রস’, যা বিকেলে খেজুরগাছ কাটার পর সন্ধ্যার দিকে সংগ্রহ করে থাকে।
খেজুরের রসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামের মানুষের শীতের জীবন। রস সংগ্রহের মৌসুম এলেই বাজারে গুড়মেলা বসে। রস থেকে তৈরি নলেন গুড়, দানাদার গুড় এবং পাটালি গুড়। এখনো যশোরের অনেক পরিবার খেজুরগাছের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। একেকজন গাছি মৌসুমে ৫০-১০০টি গাছ কাটে। শীতের তিন মাসে রস ও গুড় বিক্রি করে অনেকে লাখ টাকার মতো আয় করে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ও দেশীয় বাজারে খাঁটি খেজুরের গুড়ের বেশ ভালো রকমের চাহিদা রয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত বাঙালিদের কাছে এ গুড়ের চাহিদা অনেক। তা ছাড়া দেশব্যাপী গুড়ের চাহিদা প্রচুর। প্রতি বছর প্রায় ৫০০ টন গুড় উৎপাদন করা হয়, যার বাজারমূল্য ৬৫ কোটি টাকার মতো; যা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে রপ্তানিযোগ্য।
খেজুর গুড় শুধু স্বাদে নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে থাকে প্রাকৃতিক ভিটামিন, খনিজ ও আয়রন। এটি রক্তশূন্যতা দূর করে, শরীরে শক্তি জোগায়, হজমে সাহায্য করে এবং শীতের অসুস্থতা কমাতে সহায়তা করে। কৃত্রিম চিনি যেখানে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, সেখানে খেজুরের গুড় প্রাকৃতিক এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প। ব্রিটিশ আমলে খেজুরের গুড়কে মূল্যবান অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ব্রিটিশরা এ খেজুর রসের লালচে চিনিকে ব্রাউন সুগার বলত। যশোরের ঝিকরগাছা, চৌগাছা অঞ্চলে প্রায় ৫০০টি চিনিকল ছিল। পরবর্তীকালে সাদা চিনির উদ্ভব ও চাহিদা বাড়লে এ খেজুর রসের ব্রাউন সুগারের বাজারে ব্যাপক ধস নামে। বর্তমানে যশোরে খেজুরগাছ আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কৃষিজমি পরিবর্তন, রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির পরিবর্তন, আধুনিকীকরণ—সবকিছু মিলিয়ে খেজুরগাছের সংখ্যা কমছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আর গাছির কষ্টকর পেশায় আসতে চায় না। তাই এখন দরকার পরিকল্পনা—খেজুরগাছ রোপণ, গাছিদের প্রশিক্ষণ এবং রস সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা। চাই সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে সহায়তা, যাতে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা যায়। খেজুরের রস শুধু খাদ্য নয়, এটি যশোর অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির অংশ।
যশোরের খেজুরের রস ও গুড় আমাদের শীতের নিদর্শন। এ অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্য। অনেকে ঐতিহ্যগত পেশা হিসেবে এ কাজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রেখেছে। বর্তমানে বাজারে অনেক ভেজাল গুড় বিক্রি হয়, যা যশোরের এই ঐতিহ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ঐতিহ্য রক্ষার জন্য বাংলাদেশ সরকার যশোরের খেজুরের গুড়কে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণের জন্য অনেক বড় একটি উদ্যোগ। কারণ, এটা যশোর অঞ্চলের মানুষের আবেগ, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং শীতের আনন্দ।








