যে দিকে চোখ যায় একটু পর পর খড়কুটো ঘেরা টংঘর। এধরনের টংঘরেই উপজেলার কয়েকশ কৃষকের এখন অস্থায়ী আবাস। পরিবার পরিজন ছেড়ে রান্না-বান্নার হাঁড়ি-পাতিলে দ্বিতীয় সংসার পেতেছেন তারা। সেই কাকডাকা ভোরেই এখান থেকেই শুরু হয় তাদের কর্মযজ্ঞ। সকাল-বিকাল তাদের চিন্তা রসালো ফল তরমুজ উৎপাদনে।
জানা গেছে, আমতলীর আবাদি জমি তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে কৃষকের তন্ময় দৃষ্টিনিবদ্ধ থাকে ফলটি উৎপাদনে। এ এলাকার চাষিরা তরমুজ চাষে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হওয়ায় তারা জমি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করে থাকেন, যা এখানকার কৃষিতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। গত কয়েক বছর আমতলী উপজেলায় তরমুজের বাম্পার ফলন এবং বাজার দর ভালো হওয়ায় এখানকার কৃষকেরা তরমুজ চাষে ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়ছেন। দেশের বিভিন্ন বাজারে বিপুল পরিমাণ চাহিদা থাকায় এ উপজেলায় উৎপাদিত মানবদেহের উপকারী ফলটি এখানকার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।
কৃষকদের সমন্বিত দক্ষতা ও আন্তরিকতায় তরমুজ চাষে এ উপজেলায় বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এ বছর ৩ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগ আশা করছে এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে ৫ হাজার হেক্টরের উপরে। খরচের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছেন ফলটি উৎপাদনে।
হলদিয়ার এলাকার তরমুজ চাষি আলম জানান, অনেক চাষিই বেশি জমিতে উন্নত জাতের বিভিন্ন জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে খরচ বাদ দিয়ে তারা ভালো লাভবান হবেন।
তরমুজ ক্ষেতের শ্রমিক সবুজ খান বলেন, ‘সব সময় তাদের তরমুজ ক্ষেতে ব্যস্ত থাকতে হয়। জমি প্রস্তুত থেকে তরমুজ বিক্রি সব ক্ষেত্রেই তাদের শ্রম দিতে হয়। বিনিময়ে প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা তাদের বেতন দেওয়া হয়। থাকা-খাওয়া সব কিছু মালিকের।’
তিনি আরো বলেন, ‘একাজের সঙ্গে এখন অনেক শ্রমিক জড়িত।’
আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকতা রাসেল বলেন, ‘আমতলী উপজেলা কোটি কোটি টাকার তরমুজ উৎপাদন হয়ে থাকে। এখানকার মাটি, আবহাওয়া ও নদ-নদীর মিঠাপানির উৎস তরমুজ চাষের জন্য খুবই উপযোগী।’
‘এবছর তরমুজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৪ হাজার হেক্টর হলেও গতবছর তরমুজ চাষিরা বেশি দাম পাওয়ায় আশা করা যায় এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে’, বলে আশা তার।
‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প থেকে দেশের চরাঞ্চলের জমিতে খরা-সহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ফসলের জাত, উপযুক্ত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প থেকে জানা যায়, সরকারের সম্পূূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২০৯ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের সাতটি বিভাগের ৩৫টি জেলার ১২১টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে এই প্রকল্প। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)।
প্রকল্পের আওতায় কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিভিন্ন সময় মাঠ দিবস ও সেমিনার বা ওয়ার্কশপের আয়োজন করে কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক ফসল লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক(পিডি) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পতিত জমি ব্যবহারের মাধ্যমে চর অঞ্চলের শস্যের নিবিড়তা ১৪০ শতাংশ থেকে ১৪৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এর ফলে শস্য বৈচিত্র্য ও কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
আশা করছি, প্রকল্পটির মাধ্যমে কৃষকরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন তেমনি দেশের চরাঞ্চলের জমিতে খরা সহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ফসলের জাত, উপযুক্ত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে।








