শাফিউল আল ইমরান: আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। চলতি বাজেটে এ কর্মসূচি আরও এগিয়ে নিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের ১০০টি উপজেলায় সাড়ে ৪২ লাখ কৃষক এই কার্ড পাবেন। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিবছর একবার আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা পাবেন।
চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করে সরকার। দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনমানের উন্নয়নে বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে ‘প্রি-পাইলটিং’ হিসেবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেসময় প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তন হলেই দেশ ও দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃষক যেন ন্যায্য মূল্য ও অধিকার পান- এই লক্ষ্যেই ‘কৃষক কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এই কার্ড পাওয়ার আনন্দে উচ্ছ্বস দেখান কৃষাণ ও কৃষাণীরা। কুমিল্লা সদর থানার অরণ্যপুরের মোঃ রবিউল বাশার খান । সম্প্রতি তিনি কৃষি কার্ড পেয়েছেন। তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘ এটা সরকারর একটা বিশাল কাজ। দেশের মানুষ আমরা যারা কৃষি পর্যায়ে আছি খ্ষেত খামারে তারা আজ এমন সুযোগ সুবিধা নিয়ে কখনোই চিন্তা করতামনা। সরকার এই কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে যে কৃষকদের জন্য এত উপকার করছে তা বলে শেষ করা যাবেনা।’
তিনি আরোও বলেন, ‘এই কার্ডের সুযোগ সুবিধার মধ্যে আছে কোন কৃষি পণ্য কিনতে গেলে কম দামে পাওয়া যায়। কৃষি যন্ত্রপাতি কিনতে লোন নিতে গেলে এই কার্ড থাকলে সহজেই পাওয়া যায়।
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মোছা: তাহমিনা আকতার তানিয়া, সম্প্রতি তিনিও উপজেলা অফিস থেকে কৃষি কার্ড পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কৃষক কার্ড পেয়ে আমি অনেক খুশি। কারণ, কার্ডটি পাওয়ার পর আমার নিকট আড়াই হাজার টাকা এসেছে। এই টাকা দিয়ে আমি আমার পোষা গরু ছাগলেল জন্য খাবার কিনেছি।’
তিনি আরোও বলেন, ‘এই কার্ডের টাকায় যে দোকান থেকে খাবার কিনেছি সেটা অন্য দোকানের চেয়ে কম দামে পেয়েছি আমার লাভ হয়েছে।’
রাজবাড়ীর কৃষক মো:রজব আলী শেখ বাবুও কৃষক কার্ড পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কার্ড পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে আমার টাকা পৌঁছে গেছে। এটা আমাদের পরিবারের অনেক কাজে লাগবে। তারেক রহমানের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তাকে দীর্ঘায়ু করুন।’
‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফর্মেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘নিঃসন্দেহে বাজেটটি কৃষি বান্ধব কারণ সরকার এই বাজেটে এক হাজার ৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেকেছে সরাসরি কৃষককে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য। আমরা এই অর্থবছর ৪২ লক্ষ কৃষককে কৃষক কার্ড দিব, এই কার্ডটি একটা ডেবিট কার্ড পাশাপাশি ৬২ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়া হবে যা সরাসরি কৃষকের ব্যাংক একাউন্টে টাকাটা চলে যাবে। বাংলাদেশে এই উদ্যোগটই প্রথম।’
তিনি আরোও বলেন, ‘আমরা এবার ১০০টি উপজেলার কৃষককে দিবো। আগামী চার বছরের মধ্যে সারা বাংলাদেশের সকল কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। এর আওতায় প্রত্যেক কৃষককে আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হবে।’
বাজেটে দেশে স্থানীয়ভাবে কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে কীটনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামাল আমদানির ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেছে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট হার শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘সরকার বাজেটে কৃষকের উৎপাদন খরচটা কমে এই চিন্তা করে কীটনাশক উপর থেকে যে ভ্যাট ট্যাক্স প্রত্যাহার করছে। এর ফলে কৃষক সহজে কম দামে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে পারবে । তাই টোটালি জনবন্ধন বাজেট।’
বাজেট বক্তৃতায় গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তর আনতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ১০টি সেবা পৌঁছে দিতে সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই কর্মসূচির প্রি-পাইলটিং হিসেবে দেশের আটটি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষককে কার্ড দেওয়া হয়েছে। মংস্যচাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণচাষিদেরও এই বিশেষ কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে।’
সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার হলো, কৃষিকে জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করা। কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তর আনতে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় ১০টি সেবা পৌঁছে দিতে গত পহেলা বৈশাখ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি চালু করে সরকার।
তিনি আরোও বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে ১০০ উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়া হবে এবং দেশের সব কৃষককে পর্যায়ক্রমে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা প্রতিবছর একবার আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আরও ১০ ধরনের বহুমুখী সুবিধা পাবেন।’
অর্থমন্ত্রী বলেন,‘ প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য কৃষিবিমা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।’
কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে তফশিলি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লিঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারিত করা হবে। এ ছাড়া আমদানি–নির্ভরতা কমাতে ডাল, তৈলবীজ, মসলা ও ভুট্টা চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণ চাষে ৪ শতাংশ এবং পার্বত্য জেলায় কৃষকদের জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) মাধ্যমে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
যে সুবিধা পাবেন কৃষকরা:
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কৃষক কার্ডের আওতায় একজন কৃষক প্রাথমিকভাবে ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক সংগ্রহ, সরাসরি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রাপ্তি, সাশ্রয়ী সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির সুযোগ, প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার তথ্য এবং রোগবালাই দমন-সংক্রান্ত পরামর্শ। এই উদ্যোগের আওতায় প্রতিটি কৃষক পরিবার একটি করে কৃষক কার্ড পাবে। তবে নির্ধারিত শ্রেণির কৃষক ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নীতিমালা অনুযায়ী, এই অর্থ দিয়ে সার, বীজ, কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ এবং মৎস্য ও গবাদি পশুর খাদ্য সংগ্রহ করা যাবে। শস্য উৎপাদনকারী কৃষকের পাশাপাশি মৎস্য চাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও এ সুবিধার আওতায় থাকবেন।








