মিথুশিলাক মুরমু
‘পানির অপর নাম জীবন’—সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন বলা হচ্ছে, বিশুদ্ধ পানির অপর নামই জীবন। আর এই পানি নিয়েই চলছে আদিবাসীদের জীবনসংগ্রাম। বিশেষত বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের এ সংগ্রাম এখন নিরন্তর।
সাধারণভাবে বরেন্দ্রভূমি বলতে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাগুলোকে বোঝায়। ৪০ বছর আগেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি ছিল সহজলভ্য। সরকারের পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা ও ওয়াপদার জরিপে দেখা যায়, এই ২১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৮৭টি ইউনিয়নই বর্তমানে পানির চরম সংকটে রয়েছে।
১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বরেন্দ্র এলাকায় মাটির নিচে পানির গড় নিম্নস্তর ছিল ৩৫ ফুট। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে তা ৭০ ফুটে নেমে আসে। কোনো কোনো এলাকায় এই স্তর ২০০ ফুটেরও নিচে চলে যায়। এই অঞ্চলের ভূমির গঠন ˆশলী উঁচু-নিচু সিঁড়ির মতো এবং লাল এঁটেল মাটির প্রাধান্য বেশি। বৃষ্টির অভাবে এই মাটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো হয়ে যায়, আর সামান্য বৃষ্টিতেও পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে এই অঞ্চলের কৃষক ও প্রান্তিক মানুষদের প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়।
খাদ্য ও পানি মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের অন্যতম শর্ত। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে (রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ) বসবাসরত সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, মালো, কোলসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে পানি আজ দীর্ঘস্থায়ী ও নির্মম সংগ্রামের নাম। একদিকে প্রকৃতির রুক্ষতা, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির আশঙ্কাজনক পতন এবং কাঠামোগত সামাজিক বৈষম্য—এই তিনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে বরেন্দ্রভূমির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন চরম অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত।
ভৌগোলিক গঠনের কারণেই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি লাল এবং এর পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত দুই দশকে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হতো, এখন সেখানে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতি বছর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে (বিশেষ করে মার্চ থেকে মে) পানির স্তর স্বাভাবিকের চেয়ে ৭০-৮০ ফুট, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ২শ’ ফুটেরও নিচে নেমে যায়। ফলে সাধারণ হস্তচালিত টিউবওয়েল তো বটেই, অনেক গভীর নলকূপও পানি তুলতে ব্যর্থ হয়।
আদিবাসী পাড়াগুলো সাধারণত মূল সমতল থেকে দূরে, উঁচু ঢিবি বা প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এই সংকট তাদের ওপর সবচেয়ে আগে এবং সবচেয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করে।
পানি সংকটের সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ শিকার আদিবাসী নারীরা। সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মুণ্ডা, কোল, পাহান, তুরী, রাজোয়াড়, ভূঁইয়া, কর্মকারসহ আদিবাসী সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে পানি সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব নারীদের ওপর বর্তায়।
খরা মৌসুমে তীব্র রোদ ও ৪০-৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপেক্ষা করে নারীরা মাইলের পর মাইল হেঁটে দূরের সচল গভীর নলকূপ বা খাড়ি (প্রাকৃতিক খাল) থেকে পানি সংগ্রহ করে। এক কলস পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা শুধু পানি সংগ্রহে ব্যয় হওয়ায় তারা চরম শারীরিক ক্লান্তি ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে।
বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক সময় তারা পুকুর, ডোবা বা দূষিত খাড়ির পানি পান ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। ফলে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড ও আর্সেনিকোসিসসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ এবং নারীদের জরায়ুর সংক্রমণ ও চর্মরোগ ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
বরেন্দ্র অঞ্চলের অধিবাসীদের প্রধান জীবিকা ধান চাষ, যা অত্যন্ত পানিনির্ভর। কিন্তু পানি বণ্টনে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পরিচালিত গভীর নলকূপগুলোর নিয়ন্ত্রণ সাধারণত স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মহলের হাতে থাকে। ফলে প্রান্তিক ও আদিবাসী কৃষকেরা পানি বণ্টনে পিছিয়ে পড়ে। প্রভাবশালী কৃষকদের জমি আগে সেচ পায়, আর আদিবাসীদের জমি পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যায়।
২০২২ সালের ২৩ মার্চ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার ঈশ্বরীপুর গ্রামে সেচের পানি না পেয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় দুই সাঁওতাল ভাই—অভিনাথ মারান্ডি ও রবি মারান্ডি—গভীর নলকূপের সামনে বিষপানে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এটি বরেন্দ্র অঞ্চলের কাঠামোগত বৈষম্যের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।
পানি সংকট শুধু জীবিকা নয়, আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও সামাজিক কাঠামোকেও ভেঙে দিচ্ছে। জীবিকার অভাবে বহু পরিবার গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যাচ্ছে। তারা গার্মেন্টস শিল্প, ইটভাটা ও নির্মাণশ্রমে যুক্ত হচ্ছে।
ফলে গ্রামীণ আদিবাসী জনপদগুলো পুরুষশূন্য হয়ে পড়ছে এবং ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পদ্মা নদীর পানি খালপথে বরেন্দ্র অঞ্চলে আনার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষর পানি ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী কৃষকদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রাচীন পুকুর, খাস জলাশয় ও খাড়ি পুনঃখনন ও সংরক্ষণ করা। কমিউনিটি ভিত্তিক বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। কম পানিনির্ভর ফসল চাষে কৃষকদের প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ দেয়া।
বরেন্দ্রভূমির আদিবাসীদের পানি সংকট কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবাধিকার সংকট। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হবে, যখন এই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও তার অন্তর্ভুক্ত হবে।
রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই এই নীরব সংকটের দিকে মনোযোগ দিতে হবে—নইলে বরেন্দ্রভূমির এই জীবনসংগ্রাম আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
[লেখক: কলামিস্ট]
[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এগ্রি সংবাদ সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, এগ্রি সংবাদ কর্তৃপক্ষের নয়। ]








