মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করে সকল বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ জনশক্তি রপ্তানিকারকরা। একই সঙ্গে বিগত সরকারের আমলে শ্রমবাজারে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত সিন্ডিকেট হোতাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিষয়টি সুরাহা করতে গত রবিবার (৫ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন তারা।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের যোগসাজশে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে চরম অরাজকতা ও দুর্নীতি হয়েছে এবং শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। মালয়েশিয়া অন্যান্য ১৪টি দেশ থেকে কর্মী নিলেও বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে লাইসেন্সের সীমাবদ্ধতা বা সিন্ডিকেট নেই। অথচ বাংলাদেশে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সিন্ডিকেটের বীজ বপন করা হয়েছিল । এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন এবং মালয়েশিয়ার অনলাইন পদ্ধতি এফডব্লিউসিএমএস -এর মালিক দাতোশ্রী আমিন নুরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ, সালমান এফ রহমান, লোটাস কামাল, নিজাম উদ্দিন হাজারী এবং বেনজীর আহমদের মতো সাবেক মন্ত্রী ও এমপিরা এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ তাদের।
তারা আরোও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে সিন্ডিকেট চক্রটি অতিরিক্ত ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায় করেছে, যার ফলে প্রত্যেককে মালয়েশিয়া যেতে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা খরচ করতে হয়েছে। দুই দফায় মালয়েশিয়ায় প্রেরিত প্রায় ৮ লাখ কর্মী থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে এবং এর একটি বড় অংশ দাতোশ্রী আমিনকে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে পলাতক রুহুল আমিন স্বপন ও তার সহযোগীরা বিদেশে বসে পুনরায় মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে সিন্ডিকেট করার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে স্মারকলিপিতে বলা হয়।
শ্রমবাজারকে পুনরায় সচল, স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত করতে স্মারকলিপিতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক সংশোধন করে রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের ধারাটি পরিবর্তন করা। পাশাপাশি, অভিবাসন খরচ কমাতে বুয়েট -এর তৈরি অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন করে একটি কেন্দ্রীয় ডেটা ব্যাংক গঠন এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীদের লেনদেন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া সরকার যদি সীমিত লাইসেন্সের মাধ্যমে কর্মী নিতে চায়, তবে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরকারি সংস্থা বিএমইটি বা বোয়েসেল-কে প্রধান এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘মালয়েশিয়া শ্রমবাজার তো এর আগে বিগত সরকারের আমলে আপনার এই যে অনিয়ম দুর্নীতি সিন্ডিকেট হইয়া এটা অনেক কিছু হলেও আপনারা সবাই জানেন। তা এখন আমরা চাচ্ছি যে, এই আবার কোন সিন্ডিকেশন না হয়ে কোন ব্যক্তি গোষ্ঠীর কাছে শ্রমবাজারটা জিম্মি না হয়ে শ্রমবাজারটা যেন খুলে দেয় এবং এটা সবার জন্য যেন খোলা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘ আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট ৫৫ জনরে সাক্ষরে স্মারকলিপি দিয়েছি। এর অর্থ এইনা যে আবার ৫৫ জনের সিন্ডিকেশন হবে। একজন একেক দেশের স্পেশালিস্ট তো সেই জন্য আমরা বলছি যে মুক্ত থাকতে হবে, এখানে আমরা বলছি যে যারা সক্ষমতা রাখেন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে, যারা কাজ করতে চায় তারা কাজ করবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই যার যার যোগ্যতা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সে যেন কাজ করার সুযোগ পায়। হ্যাঁ। প্রয়োজনে গভমেন্ট স্ট্রিক্টলি তার এই বিষয়টা দেখবে যে; কে কত টাকায় কর্মী পাঠাবে একটা যুক্তিসঙ্গত বাস্তবসম্মত একটা খরচ নির্ধারণ করে সেটাকে কন্ট্রোল করার জন্য একটা মেকানিজম। সে প্রস্তাবটাও আমরা দিয়েছি।’
সেইসাথে; শ্রমীকবান্ধব কর্মী পাঠাতে সরকার একটা টাস্ক করতে পারে বলে মত দেন ফখরুল।
বন্ধ শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ৮ এপ্রিল মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ-১৯৭ ফ্লাইটে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করবেন। প্রতিনিধিদলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।








