মাহিউল কাদির: বাংলাদেশকে বৈশ্বিকভাবে অন্যতম জলবায়ু–ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বহু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সংস্থা ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে, ভৌগোলিক অবস্থান, নিম্নভূমি ডেল্টা অঞ্চল, ঘনবসতি এবং দারিদ্র্য—এই চারটি প্রধান কারণ বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিএডি) তাদের ২০২৪ সালের ক্লাইমেট চেঞ্জ ইমপ্যাক্ট ইন বাংলাদেশ প্রতিবেদনে একই বাস্তবতার পুনরাবৃত্তি করেছে। আইপিসিসির পঞ্চম মূল্যায়ন প্রতিবেদন বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
পরিস্থিতির সবচেয়ে বৈপরীত্যপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের মাত্র ০ দশমিক ৫ শতাংশেরও কমের জন্য দায়ী। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক অভিঘাত বহন করতে হচ্ছে দেশটির মানুষকে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এ বাস্তবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বারবার আলোচিত হলেও কার্যকর সহযোগিতা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। প্রতি বছর জাতিসংঘ আয়োজিত কপ (Conference of the Parties) সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও জ্ঞান সহায়তার প্রত্যাশা করে থাকে।
বাংলাদেশের সরকারি প্রতিনিধি, গবেষক, উন্নয়নকর্মী এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ নিয়মিত এসব সম্মেলনে অংশ নিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কেবল নীতিনির্ধারণী আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি প্রতিদিন লক্ষ মানুষের জীবনযাত্রাকে বদলে দিচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছেন।
উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তবতা বোঝার জন্য সম্প্রতি কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে রাবেয়া খাতুনের গল্প জলবায়ু পরিবর্তনের মানবিক দিকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। চল্লিশোর্ধ্ব এই নারী চার সন্তানের মা এবং একজন বিধবা। তাঁর স্বামী সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। স্থানীয়ভাবে মধু সংগ্রহকারীদের ‘মাওয়ালী’ বলা হয়, যারা প্রতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সুন্দরবনে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনই নয়, এটি হাজারো মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস।
দশ বছর আগে রমজানের ঈদের ঠিক আগে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে রাবেয়ার স্বামীর মৃত্যু হয়। সেই ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির পর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত তাঁর জীবনে নতুন সংকট তৈরি করেছে। আগে বাড়ির পাশে থাকা চারণভূমিতে গবাদিপশু চরিয়ে সংসার চালাতে পারতেন তিনি। কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সেই জমি এখন আর ব্যবহারযোগ্য নয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি ও জীবিকার সুযোগ কমে যাওয়ায় অনেক মানুষ মৌসুমি অভিবাসনে বাধ্য হচ্ছে। বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জীবিকার সন্ধানে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার মানুষ ঢাকায় আসে। তবে রাবেয়া ঢাকায় না গিয়ে শ্যামনগর ছেড়ে সাতক্ষীরা শহরে আশ্রয় নেন এবং কয়েকটি পরিবারে গৃহকর্মীর কাজ শুরু করেন। কিন্তু তাঁর আয় পাঁচ সদস্যের পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে তাঁর দুই বড় ছেলে পড়াশোনা বন্ধ করে মুদি দোকান ও রেস্টুরেন্টে কাজ করতে শুরু করেছে।
প্রতি বছর গ্রামে গেলে রাবেয়া দেখতে পান, তাঁর পরিচিত পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। মিঠাপানির উৎস প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষ এখন বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের সময় ও ধরনও বদলে গেছে।
এই সংকট নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সুপেয় পানির অভাবে অনেক নারী ও কিশোরী বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি ব্যবহার করছেন, বিশেষ করে মাসিকের সময়। অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা তাঁদের প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাবেয়া নিজেও স্ত্রী–রোগজনিত সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাঁকে বেশি মিঠাপানি পান করতে বলা হলেও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ২–৩ লিটার পানীয় পানি প্রয়োজন এবং রান্না ও পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতাসহ মোট ৫০–১০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানি এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। পরিবারের জন্য দূর থেকে পানি সংগ্রহ করা রাবেয়ার দৈনন্দিন সংগ্রামের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখনও কখনও তাঁকে দূষিত পানিও ব্যবহার করতে হয়।
বর্তমানে সাতক্ষীরা পৌরসভার একটি বস্তিতে চার সন্তান নিয়ে ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস করছেন রাবেয়া। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতায় তাঁদের জীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। পানি সংগ্রহ, রান্না ও কর্মস্থলে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ তখন নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়, অথচ প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা তাঁদের নাগালের বাইরে।
রাবেয়া খাতুনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি মানবিক সংকটও। এ সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে প্রতি বছর অভিযোজন কার্যক্রমে প্রায় ৮.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষে এই বিশাল অর্থনৈতিক চাপ বহন করা সম্ভব নয়।
উন্নত দেশগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকারের কথা বলে থাকে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাবেয়ার মতো লাখো মানুষ বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বাংলাদেশের মানুষের টিকে থাকা শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্ব। রাবেয়া খাতুনের মতো মানুষের সংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বৈশ্বিক সংহতি এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য।
মাহিউল কাদির, একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার বিজনেস ডেভেল্পমেন্ট বিভাগের প্রধান, mahiulkadir@gmail.com








