মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: জৈব কৃষি প্রচলিত জনপ্রিয় ধারণা। অনেকেই এটিকে ধনী শ্রেণির কৃষি হিসেবে বিবেচনা করেন, কেউ কেউ এটিকে সনাতনী কৃষি ব্যবস্থার ধারাবাহিক উন্নত সংস্করণ হিসেবে দেখছেন। জৈব কৃষি থেকে উৎপাদিত পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত, গুণগত মানের দিক দিয়ে অতুলনীয় সেই সাথে স্বাদে অন্যান্য। বাংলাদেশে জৈব কৃষি একটি উদীয়মান ও টেকসই কৃষি পদ্ধতি, যা মূলত শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ রাসায়নিকমুক্ত খাদ্যের উৎস হিসেবে এটি গ্রহণ করছে। দিন দিন মানুষের আস্থা অর্জন করছে।
জৈব কৃষির ধারণাটি বেশ পুরনো। মূলত মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং কৃষিজ পরিবেশ রক্ষার কথা চিন্তা করেই জৈব কৃষির উদ্ভব। বিংশ শতাব্দির গোড়ার দিকে জৈব কৃষির চিন্তা শুরু। উন্নত টেকসই কৃষির ভাবনা থেকেই জৈব কৃষির যাত্রা শুরু। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার আলর্বাট হাওয়ার্ড জৈব কৃষি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কাজ করেন। একারণে উনাকে জৈব কৃষির জনক বলা হয়। ১৯০৫-১৯২৪ সালের দিকে পুসা, বেঙ্গলে সনাতনী কৃষি ব্যবস্থার উপর কাজ করার সময় জৈব কৃষির ধারণাটি ডকুমেন্টশন করেন। এবিষয়ে উনি একটি গবেষণা পত্র লিখেন ( An Agricultural Testament), যা পরবর্তীতে কৃষি বিজ্ঞানীদের আগ্রহ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশে জৈব কৃষি
বাংলাদেশে কৃষির বিকাশ শুরু হয় জৈব দিয়েই। ৭০ দশকের পূর্বে কৃষি ব্যবস্থা ছিল প্রাকৃতিক সার ও উপকরণের ওপর নির্ভর। পরবর্তীতে সবুজ বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত অবক্ষয়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৯৭০–৮০ দশকের শেষভাগে কিছু এনজিও’র উদ্যোগে জৈব কৃষি একটি সংগঠিত আন্দোলনে রূপ নেয়। বর্তমানে জৈব কৃষি বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান। এটি মূলতঃ এনজিও-নির্ভর খাত, যার লক্ষ্য টেকসই কৃষি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা। ৭০ দশকের পূর্বে (সবুজ বিপ্লব-পূর্ব সময়) কৃষি কার্যক্রম সম্পূর্ণ জৈব নির্ভর ছিল। কৃষকরা ফসল উৎপাদনে গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ ও কম্পোস্ট ব্যবহার করতেন।
৭০ দশক পরবর্তীতে সবুজ বিপ্লবের নামে উচ্চ ফলনশীল জাত (HYV) চাষাবাদ শুরু হলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ে। এর ফলে জৈব কৃষি ধীরে ধীরে প্রান্তিক অবস্থায় চলে যায়। ১৯৭৮ সালের পরবর্তী সময় কিছু এনজিও জৈব কৃষির আন্দোলনে যুক্ত হয়। উনারা মূলত মাটির অবক্ষয় রোধ ও খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে টেকসই ও রাসায়নিকমুক্ত কৃষির পথিকৃৎ হিসেবে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) জৈব কৃষি বিষয়ে পরিকল্পিত ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করে।
জৈব কৃষি কি
আমাদের দেশে অনেকেরই ধারণা হলো জৈব সার বিশেষ করে গোবর বা কম্পোস্ট এবং জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্যই বোধ হয় জৈব কৃষি পণ্য বা অর্গানিক পণ্য। বিষয়টি কিন্তু সেরকম নয়। জৈব কৃষি হলো একটি হলেস্টিক এপ্রোচ; যেখানে বীজ, জৈব সার, জৈব বালাইনাশক, পানি ব্যবস্থাপনা সকল কিছুই হতে হয় জৈব উৎসের। অনেক সময় এটি এমন জায়গায় উৎপাদন করতে হয় যেখানের আশে পাশে সকল কৃষি ব্যবস্থাপনা জৈব পদ্ধতির হতে উৎপাদন ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে স্থাপিত কৃষি খামারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার হয়, এসকল কীটনাশক ও রাসায়নিক সার মাটিতে চুইয়ে এক জমি হতে অন্য জমিতে যায়, বায়বীয় রাসায়নিক পেস্টিসাইড সমূহ বাতাসের সাহায্যে এক জমি হতে অন্য জমিতে যায়। এগ্রো ইকোসিস্টেমে বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভবনা থাকে। এসকল কারণে জৈব খামারসমূহ নিরাপদ দূরুত্বে স্থাপন করতে হয়।
রাসায়নিক পেস্টিসাইড ব্যবহার
সবুজ বিপ্লবের নাম করে আধুনিক কৃষির গোড়াপত্তন শুরু হয় ৭০ দশকে, সেই সময় ৪০০০ মে.টন পেস্টিসাইড ব্যবহার হলেও বর্তমানে এটির পরিমাণ প্রায় ৪০৮৩২ মে. টন (ডিএই, ডেইলি স্টার, ২৫.১১.২৫), যার মধ্যে একটিভ ইনগেডিয়েন্ট (মূল বিষাক্ত উপাদান) প্রায় ১৫ হাজার মে.টন। কৃষি জমিতে প্রতি হেক্টরে পেস্টিসাইডে ব্যবহার ১.৮ কেজি। বাংলাদেশের ব্যবহৃত রাসায়নিক পেস্টিসাইডের মধ্যে ধানের জমিতেই ৮০% ব্যবহৃত হয়। মোট ব্যবহৃত পেস্টিসাইডের মধ্যে ছত্রাকনাশক ব্যবহার হয় ৪৫.০৯%, কীটনাশক ৩৮.৮৫% এবং আগাছানাশক ১৫.১৫%। বাংলাদেশে প্রায় ৮ হাজার পেস্টিসাইড রেজিস্ট্রেশন প্রদান করা হয়েছে। বিশ্বে ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত এরকম ১৭টি অতি ক্ষতিকর পেস্টিসাইড বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। ৩৭% কৃষক সবজি উৎপাদনে একবার, ৩১% কৃষক দুইবার এবং বাকী কৃষকরা ততোধিকবার পেস্টিসাইড ব্যবহার করে থাকে। কেউ কেউ আছে সবজি উৎপাদনে ১৭-৩১ বার পেস্টিসাইড ব্যবহার করেন। এতে করে স্থাস্থ্য ঝুকি বাড়ছে। ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্বসহ বিভিন্ন জটিল রোগে কৃষকরা আক্রান্ত হচ্ছে। কৃষকের স্বাস্থ্য রক্ষা, নিরাপদ ফসল উৎপাদন, পরিবেশ সুরক্ষা কারণে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
বাংলাদেশের জৈব কৃষির মার্কেট শেয়ার
২০২৫ সালে জৈব কৃষির মার্কেট শেয়ার ছিল ১৪৩ মিলিয়ন ডলার, যার ২০৩১ সালে ২২৫ মিলিয়ন দাঁড়াবে বলে গবেষণায় ধারণা করা হয়। বাংলাদেশে প্রায় ২০০০০ হেক্টর জমিতে জৈব পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন করা হয়। অথচ বিশ্বে এ খাতের মার্কেট শেয়ার ১৪৫ বিলিয়ন ডলার এবং ৯৯ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। বাংলাদেশের জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত চা-সহ বেশ কিছু পণ্য জার্মানী, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে।
জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত পণ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের চেয়ে জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফসলের উৎপাদন ক্ষেত্র বিশেষে ৫ থেকে ৩৪ শতাংশ কম হয়। উৎপাদন কম হলেও পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তার নিরিখে এটি তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। অযৌক্তিক রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে কৃষি এবং পরিবেশের উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ে সেটি হতে ফেরার উপায় হলো জৈব কৃষিতে নজর দেয়া। জৈব কৃষি ব্যবস্থপনায় সমন্বিত পদ্ধতি প্রচলন করা প্রয়োজন। জৈব সারের উৎস হিসেবে পোল্ট্রি ও ডেইরীতে শিল্প এবং সেই সাথে মৎস খামার। এই তিনটি সমন্বয়ে বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলতে হবে। জৈব ব্যবস্থপনায় চাষাবাদ করলেই হবে না এটির সার্টিফিকেশন এবং লিগ্যাল ভিত্তি নিয়ে কাজ করা দরকার। সার্টিফিকেশন এবং লিগ্যাল ভিত্তি নিশ্চিত করা না গেলে দেশে বিদেশে গ্রাহকের কাছে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা পাবে না।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩০ মিলিয়ন লোক খাদ্য বাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। খাদ্য চেইনে জীবাণু উপস্থিতির কারণে এসকল রোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মাটি উর্বর, সহজেই ফসল উৎপাদন করা যায়। একারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব কৃষির দিকে মানুষ দিন দিন আকৃষ্ট হচ্ছে। মাটি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সার প্রয়োগ করা বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের জন্য আধুনিক কৃষিতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয় যেখানে জৈব এবং রাসায়নিক এর সমন্বিত যৌক্তিক ব্যবহারের পরামর্শ প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে কৃষিজ উৎপাদন সঠিক রেখে মান সম্মত পণ্য উৎপাদনের বিষয়টি উৎসাহিত করা হয়।
আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশ সুরক্ষায় এবং টেকসই কৃষি প্রযুক্তি নিশ্চিতকরণসহ কৃষকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের বিকল্প নাই। সবাই মিলে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ি।
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান
প্রকল্প পরিচালক, রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প, ডিএই।








