মাহিউল কাদির:
গত বছর ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি)-এ আয়োজিত CAPSTONE নামে তিন সপ্তাহব্যাপী একটি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। দেশের বিভিন্ন খাতের পেশাজীবীদের সঙ্গে এই কোর্সে অংশ নিয়ে নিরাপত্তা, রাষ্ট্র পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ হয়। আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল ‘নন-ট্র্যাডিশনাল থ্রেটস’—যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে ক্রমেই একটি গভীর ও কাঠামোগত সংকটে রূপ নিচ্ছে।
নন-ট্র্যাডিশনাল থ্রেটস বলতে এমন সব নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে বোঝায়, যেগুলো সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যসেবা সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক সংঘাত—এসবই এই ধরনের হুমকির অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি সিস্টেমিক হুমকি, যা দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণকে নীরবে ক্ষয় করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান এই সংকটের সামাজিক দিকটি বুঝতে সহায়তা করে। ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকায় নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ২০২৪ সালে ৯,০০২ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১১,০০৮-এ দাঁড়িয়েছে—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ বেশি। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই সহিংসতার বৃদ্ধির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করা কঠিন হলেও পরোক্ষ যোগসূত্র উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায় ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ১৫–২০ লাখ রিকশাচালক রয়েছেন এবং সারা দেশে আরও ১০–১৫ লাখ। অর্থাৎ দেশে মোট রিকশাচালকের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। পরিবারসহ এই জনগোষ্ঠীর মোট আকার দাঁড়ায় প্রায় এক কোটিতে। জলবায়ু দুর্যোগে জীবিকা হারানো প্রান্তিক মানুষ ক্রমেই রিকশাচালনার মতো অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে ঢাকায় রিকশাচালকের সংখ্যা দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় দ্রুত হারে বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,০০০ মানুষ ঢাকায় অভিবাসিত হচ্ছেন—যাদের বড় অংশই জীবিকার সন্ধানে আসা জলবায়ু অভিবাসী। এই অভিবাসন কেবল শহরের জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে না; বাড়াচ্ছে কাজ, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর চাপ।
এই বাস্তবতার একটি মানবিক চিত্র পাওয়া যায় ঢাকার এক বস্তিতে বসবাসকারী এক রিকশাচালকের জীবনের গল্পে। তিনি জানান, তার স্ত্রী গৃহকর্মীর কাজ করেন। তাদের দুই ছেলে বর্তমানে মাদকাসক্ত এবং পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। ছেলেদের এই বিপথগামিতার কারণ জানতে চাইলে তিনি তাদের জীবনের করুণ ইতিহাস তুলে ধরেন।
পরিবারটির আদি নিবাস ছিল দক্ষিণাঞ্চলের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ ভোলা জেলায়। সেখানে তাদের কৃষিজমি ও গবাদিপশু ছিল, যা দিয়ে স্বচ্ছলভাবেই জীবন চলত। কিন্তু বারবার বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে কৃষিজমি ও বসতভিটা হারিয়ে শেষ পর্যন্ত তারা ঢাকায় একটি বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
শৈশবে দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করত এবং পড়াশোনায় ভালো ছিল। প্রতিবেশীদের কাছেও তাদের সুনাম ছিল। কিন্তু ঢাকার বস্তিতে এসে পরিবারটির স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়ে। ছোট ঘরে তীব্র গরমে রাত কাটানো কঠিন হয়ে ওঠে। খেলাধুলার কোনো খোলা জায়গা না থাকায় ছেলেরা রাস্তায় সময় কাটাতে শুরু করে এবং খারাপ সঙ্গের প্রভাবে পড়ে। একপর্যায়ে তারা মাদকাসক্ত হয় এবং অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এখন তারা কোথায় আছে—পরিবারও জানে না।
এই পরিবারের করুণ পরিণতির পেছনে জলবায়ুজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, নিজ এলাকায় ফিরতে চান কি না—তিনি গভীর নিশ্বাস ফেলে বলেন, মন পড়ে থাকে নিজের এলাকায়, কিন্তু নদীভাঙনে সেই এলাকা এখন মানচিত্রেই নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্দশা লাঘবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদৃষ্টি ও অভিজ্ঞতা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নেতারাই নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে নাগরিকদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ক্ষমতায় এলে পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সাধারণ জনগণ এখন আর সাধারণ আশ্বাসে সন্তুষ্ট নয়। তারা বাস্তবসম্মত, নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য উদ্যোগ জানতে চায়।
জলবায়ু পরিবর্তন দেশের সব খাতে প্রভাব ফেললেও সবার ওপর এর প্রভাব সমান নয়। দারিদ্র্য, লিঙ্গ বৈষম্য ও সম্পদের সংকটের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর অভিঘাত আরও তীব্র হয়। বাস্তুচ্যুতির ফলে শহরে কাজ, বাসস্থান ও সেবার জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ে, সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হয় এবং সরকারি ব্যবস্থার ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি একসময় সামাজিক অস্থিরতায় রূপ নেয়—যা যুদ্ধ নয়, কিন্তু নিরাপত্তার জন্য কম হুমকিও নয়।
আপনারা যদি সত্যিই দেশকে এগিয়ে নিতে চান, তবে যেকোনো নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম ও প্রধান এজেন্ডা হওয়া উচিত পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষা। এই বিষয়টি উপেক্ষা করে জাতিকে টেকসইভাবে রক্ষা করার কোনো পথ নেই। আগামীর সরকার যেই গঠন করুক, তাকে হতে হবে জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলার সরকার।
মাহিউল কাদির,
একটি বেসরকারী সংস্থার বিজনেস ডেভেল্পমেন্ট বিভাগের প্রধান
mahiulkadir@gmail.com








