স্বাধীনতার পরে গড়ে ওঠা অব্যবস্থাপনা, দূষণ ও পরিবেশগত সংকট দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে পুরোপুরি সমাধান করা ‘বাস্তবসম্মত নয়’ বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি পরিবেশ সুরুক্ষায় আগামী সরকারকে বায়ু-শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণসহ ৭ বিষয়ে কাজ করার সুপারিশ করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘সমস্যার পাহাড় রাতারাতি সরানো সম্ভব নয়, তবে বর্তমান সরকার একটি স্বচ্ছ ও কাঠামোগত সমাধান প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করছে, যা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর।’
শনিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে ‘ম্যানিফেস্টো টক ৪: রাজনৈতিক দলগুলোর সবুজ প্রতিশ্রুতি’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে এই সুপারিশ দেন তিনি। তিনি বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণী কল্যাণ, শিল্প দূষণ রোধ, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ভবিষ্যৎ সরকারের করণীয় হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
এ সময় ইট ভাটা নিয়ন্ত্রণ, নদী ও খাল দখল রোধসহ পরিবেশ দূষণ কমাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের অন্য সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে-বন পুনরুদ্ধার, বন্যপ্রাণী কল্যাণ, শিল্প দূষণ রোধ, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
তিনি বলেন, নতুন সরকারের কাছে আবেদন থাকবে এই কয়টা ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেবেন। সরকার যদি এই ৭ দিকে মনোনিবেশ করে, প্রয়োজনীয় অর্থ দেয় তাহলে পরিবেশ দূষণ কমবে।
ইটভাটা নিয়ন্ত্রণসহ নানা উদ্যোগের ফলে ঢাকার বায়ুদূষণ পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঢাকা যতবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে ছিল, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমেছে। এটি একটি ইতিবাচক লক্ষণ। তবে জানুয়ারি মাসে আবার বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ায় নতুন করে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তার ভাষ্যে, ‘আমি এখন তথ্য মন্ত্রণালয়ে; আমি ওদিকে মন দিচ্ছি। প্রশাসন এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছে। আর ইটভাটার অভিযানটা করা যাচ্ছে না। আবার যখন জানুয়ারিতে পরপর দুবার দেখলাম বায়ুদূষণের শীর্ষে গেছে, আমি আবার ফোন করলাম ডিজিকে। আবার অভিযান হলো।’
ইট ভাটা মালিকদের আইন মানাতে হবে। এই অভ্যাস করার প্রক্রিয়াটা তো শুরু হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
উপদেষ্টা আরও বলেন, সাভার এলাকাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে সেখানে ইটভাটা বন্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও একাধিক মামলার কারণে কাজ জটিল হলেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তার ভাষায়, দিনে না চালিয়ে রাতে ইটভাটা চালানোর প্রবণতা দেখা গেছে, তবু পরিবেশ অধিদপ্তর রাতেও অভিযান চালিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পুরোনো বাস ও যানবাহন বাতিলের (স্ক্র্যাপ) নীতি দীর্ঘদিন ধরে না থাকায় দূষণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন ছিল। অবশেষে বিআরটিএ সেই নীতি চূড়ান্ত করেছে এবং শিগগির তা গেজেট আকারে প্রকাশ হবে। পাশাপাশি ১০০টি ইলেকট্রিক বাস আনার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধিমালা কার্যকর হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ সার্জেন্টদের সরাসরি জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ায় হর্ন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আসবে। নেপালের মতো এই ব্যবস্থা মানুষের আচরণ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে, বলেন তিনি।
সোনাদিয়া উপকূলীয় বনসহ প্রায় ২০ হাজার একর বনভূমি বেজা থেকে বন অধিদপ্তরের কাছে ফিরিয়ে আনার কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, মধুপুর ও চুনতি অভয়ারণ্যে বন পুনরুদ্ধারের প্রকল্পও শুরু হয়েছে। নতুন বন আইনে প্রাকৃতিক বনে কোনো ধরনের পরিবর্তন নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকার চারটি নদী ও ২০টি খাল পুনরুদ্ধারে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি সমন্বিত প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন উপদেষ্টা। তুরাগ নদী খননে আলাদা প্রকল্প প্রস্তুত রয়েছে এবং বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে চীনা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তিনি দাবি করেন, ঢাকায় এবার দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা হয়নি। এটি ছোট আকারের, কম খরচের প্রকল্পগুলোর ফল।
আগামী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, এয়ার পলিউশন, নয়েজ পলিউশন, বন পুনরুদ্ধার, শিল্প দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভাগীয় শহরগুলো থেকে রিসাইক্লিং ও সার উৎপাদন শুরু করার ওপর জোর দেন তিনি।
পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার বন্ধে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাজারে গিয়ে পলিথিন নিলে পরে বলা ঠিক নয় যে পলিথিন বন্ধ হলো না—এই পরিবর্তন আমাদেরই শুরু করতে হবে।
গ্রিন ‘ক্লিন ম্যানিফেস্টো’:
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, ‘ব্রিজ, ফ্লাইওভার বা মেট্রোর প্রতিশ্রুতি নয়, বরং রাজনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত মানুষ আদৌ নিরাপদে বাঁচতে পারছে কি-না। উন্নয়নের নামে নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত অধিকার উপেক্ষিত থাকলে সেই উন্নয়ন অর্থহীন।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির এখন প্রয়োজন একটি ‘সারভাইভাল ম্যানিফেস্টো’, যেখানে উন্নয়নের আগে মানুষের জীবন ও পরিবেশের নিশ্চয়তা থাকবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ড. কামরুজ্জামান বলেন, নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায় না। গণভবনে থাকা মানুষ এবং কড়াইল বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ—সবাই একই দূষিত বাতাস গ্রহণ করছে, এই বৈষম্যহীন দূষণের দায় রাজনীতি এড়িয়ে যেতে পারে না।
ভোটারদের উদ্দেশে ড. কামরুজ্জামান বলেন, যারা ভোট চাইতে আসবেন তাদের কাছে স্পষ্টভাবে পাঁচটি বিষয়ে অঙ্গীকার আদায় করতে হবে—শব্দদূষণমুক্ত এলাকা, যানজট নিরসন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান।
আগামী রাজনৈতিক বাস্তবতায় তিনি ‘গ্রিন ক্লিন ম্যানিফেস্টো’র দাবি জানান।








