দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের কৃষক আনোয়ার হোসেন। কৃষিই তার জীবন-জীবিকার অবলম্বন। আগে ধান চাষের উপর নির্ভরশীল থাকলেও সেখানে লাভ না হওয়ায় ভুট্টা চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, ‘ এখন হামরা(আমরা) আর ধান বেশি করিনা(আবাদ)। ধানোত খুব লাভ হয়না। ভুট্টার আবাদ করে লাভ হয়, নগদ ট্যাকা(টাকা) পাওয়া যায়।’
তিনি আরোও বলেন, ‘ প্রথম বছর হামার(আমার) নিজের দুইবিঘা জমিত ভুট্টা আবাদ করে ভালো ফলন হইচে ওই ভুট্টা বেঁচে(বিক্রি করে) ভালো লাভ হইছে। তাই এখন আর ধানের আবাদ করোচিনা(করিনা), খালি(শুধু) ভুট্টার আবাদ করচি।’
চলতি বছর আনোয়ার হোসেন নিজের দুই বিঘা জমি ছাড়াও আরো তিনি বিঘা জমি লিজ নিয়ে ভু্ট্টার আবাদ করেছেন।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের কৃষক সোহেল রানা বলেন, ‘আমাদের এলাকা নদী ভাঙন ও বন্যা কবলিত অঞ্চল হওয়ায় ভুট্টা চাষ বাড়ছে। এখন ইরি-বোরো চাষে অনুপযোগী জমিতে ভুট্টার চাষ করা হয়।’
গাইবান্ধার হরিপুর চরের মো. আব্দুর রাজ্জাক মিয়া বলেন. ‘গত পাঁচ বছর ধরে ভূট্টার আবাদ করে আসছেন তিনি। অন্য ফসলের চেয়ে ভূট্টার আবাদে কম পরিশ্রম করতে হয়। তাছাড়া সার ও পানি বেশি দেয়া লাগে না। এক বিঘা জমিতে ঘরচ হয় ১৬-১৭ হাজার। বিঘা প্রতি ফলন আসে ৩৫-৪০ মন। মৌসুমের সময় প্রতিমন ভূট্টা বিক্রি হয় হাজার টাকায়। এতে দেখা যায় বিঘা প্রতি লাভ হয় ২০-২৫ হাজার টাকা।
হরিপুর ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোজহারুল ইসলাম বলেন, চরের কৃষরা একবার চাষাবাদ করে গোটা বছরের খাবার যোগার করে থাকেন। চরের জমিতে নানা জাতের ফসল খুব ভালো হয়। নদী খনন ও ড্রেজিং না করার কারণে চরগুলো এখন আবাদি জমিতে রূপ নিয়েছে।’
শুধু আনোয়ার হোসেন, . আব্দুর রাজ্জাক বা সোহেল রানাই নন, এমন হাজারো উত্তরাঞ্চলের নদী ও চরাঞ্চলভুক্ত এলাকার কৃষক ভূট্টার আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, অল্প খরচ ও কম সময়ে ভুট্টার ভালো ফলন ও দাম ভালো পাওয়ায় ওই এলাকার চাষিরা দিন দিন ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, গত এক দশকে দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ‘দ্বিগুণের’ বেশি। গত ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ভুট্টার উৎপাদন ছিল ৬৮ লাখ ৮৪ হাজার টন। যা ২০১৫–১৬ অর্থবছরে ছিল মাত্র ২৭ লাখ ৫৯ হাজার টন।
কৃষি অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, কৃষক লাভ যেখানে বেশি দেখবেন, সেখানেই আগ্রহ বেশি দেখাবেন, এটাই স্বাভাবিক। তারা মনে করেন, কৃষক যখন ভুট্টা উৎপাদন করে ধান কিংবা গমের চেয়ে কৃষক বেশি নগদ অর্থ পাচ্ছেন তখন তারা এ ফসলটি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকবেন সেটাই স্বাভাবিক। তবে, আশার কথা হলো; দেশে উৎপাদিত ভুট্টা এই উৎপাদনের ধারা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে দেশের চাহিদার পুরোটাই জোগান দিতে পারবে। । তখন আর আমদানির দরকার হবে না।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘এ বছর উপজেলায় ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়েছে। ভুট্টা চাষে লাভ বেশি হওয়ায় উপজেলা কৃষকরা দিনদিন ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন।’
উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রাশিদুল কবির বলেন, পলি জমে থাকায় চরাঞ্চলের মাটি অনেক ঊর্বর। রাসায়নিক সার ছাড়াই যে ফসলের ফলন ভালো হচ্ছে। বিশেষ করে ভূট্টা, আলু, কুমড়া, বাদাম, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, সরিষা, তিল, তিশিসহ শাকসবজি এবং নানা জাতের ধান বেশি চাষ হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের উপ-পরিচালক মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ভুট্টার বাজার মূল্যেটা যেমন ভালো আছে তেমনি এটার ফলনও ভালো। আরেকটা বিষয় হচ্ছে; অনেকসময় দেখা যায় যারা কোম্পানী বা ক্রেতা তারা মাঠ থেকে এই ফসলটি নিয়ে যাচ্ছে। রংপুর কৃষি অঞ্চলে প্রচুর ভুট্টার আবাদ হয়।’
জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কারণটা হচ্ছে; ভুট্টার মার্কেট একটা রেডি মার্কেট। অনেক সময় তারা কন্ট্রাক ফার্মিংয়ের মাধ্যমে আগাম চাষিদের নিকট থেকে ফসলটি কিনে নেয়। সেকারণে এ ফসলটি অনেকটা ক্যাশক্রপ হিসেবে বিবেচিত। আরেকটি কারণ হলো; আমাদের দেশের ফার্মাররা খুব উৎসাহিত এই ফসলটি চাষ করতে কারণ এর প্রফিট মার্জিন ভালো। আর যেহেতু মার্কেটে ফসলটি এভেল এভেল সেকারণে তা ভালো দামে বিক্রি করে দিতে পারে সেজন্য কৃষক এটাতে লাভবান হয়।
তিনি আরোও বলেন, ‘ভুট্টাটা এখনো প্রায় তিন-চার লাখ টন আমদানি করতে হয়। আমি মনেকরি যতদিন পর্যন্ত আমরা ভুট্টা চাষে স্বাবলম্বি হতে না পারি ততদিন পর্যন্ত ভুট্টার আবাদ বাড়িয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আমি মনে করি, এখন হয়তো আরো দুইচার বছরের মধ্যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো ততদিন পর্যন্ত ভুট্টার আবাদ বাড়িয়ে যাওয়া উচিত ‘








