দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। ঠিক তেমনই এক ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো ৪০০ বছরের পুরোনো দিল্লির আখড়া। নিশ্চয়ই ভাবছেন, দিল্লির আখড়া কীভাবে এলো বাংলাদেশে! বলছি কিশোরগঞ্জ জেলার অন্যতম ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান ‘দিল্লির আখড়া’র কথা। মিঠামইন উপজেলার শেষ প্রান্তে এর অবস্থান। হাওর এলাকার অন্যতম সেরা আকর্ষণ হলো এই আখড়া।
হাওরের বুকজুড়ে জলরাশি, তার মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত হিজল গাছ, আর প্রকৃতির নিস্তব্ধতায় মোড়ানো এক রহস্যঘেরা প্রাচীন জনপদ—এ যেন রূপকথার কোনো দৃশ্য। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কাটখাল ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘দিল্লির আখড়া’ ঠিক এমনই এক বিস্ময়কর স্থান, যা বর্ষা মৌসুমে পর্যটক, গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণ।
প্রায় সাড়ে চারশ’ বছরের পুরোনো এই আখড়াকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে নানা কিংবদন্তি। বলা হয়, এক সাধক এখানে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তপস্যা করতেন। তার ধ্যান ভঙ্গ করতে কিছু দৈত্য নানাভাবে উৎপাত সৃষ্টি করতো। একসময় বিরক্ত হয়ে সাধক তার আধ্যাত্মিক শক্তিতে সেই দৈত্যদের হিজল গাছে রূপান্তর করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, আখড়াজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি হিজল গাছই সেই দৈত্যদের প্রতীক।
প্রায় তিনশ’ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই হিজল বন বর্ষা এলেই পানিতে ঘেরা অপরূপ রূপ ধারণ করে। জলের বুক চিরে গাছের সারি যেন এক স্বপ্নরাজ্যের আবহ তৈরি করে। প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৌন্দর্যই ‘দিল্লির আখড়া’কে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
জায়গাটির নামকরণ নিয়েও রয়েছে আরেকটি চমকপ্রদ ইতিহাস। প্রচলিত আছে, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় দিল্লি থেকে আসা একটি নৌবহর এ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় সোনার মোহরভর্তি একটি নৌকা ডুবে যায়। পরে সেই সাধকের অলৌকিক শক্তিতে পানির উপর ভেসে ওঠে মোহরগুলো। এ ঘটনার পর মুগ্ধ হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাম্রলিপির মাধ্যমে এই আখড়ার নামে প্রায় তিনশ’ একর জমি দান করেন। সেই থেকেই এর নাম হয় ‘দিল্লির আখড়া’।
প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি আখড়াটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও ধারক। এখানে রয়েছে ধর্মশালা, নাটমন্দির, অতিথিশালা, পাকশালা এবং বৈষ্ণবদের আবাসন। বর্তমানে আখড়ায় সেবায়েত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনন্ত দাস মোহন্ত গোসাঁই। এখানে আশ্রিত হয়ে ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমজীবী মানুষ যৌথ পরিবার পদ্ধতিতে বসবাস করছেন। নিরামিষভোজী এই মানুষদের জীবনযাপনও দর্শনার্থীদের কাছে ভিন্ন অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
দর্শনার্থীদের জন্য রাতে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। আখড়ার পাশে ঘের দেয়া দুটি পুকুর এবং ঘাটের নিরিবিলি পরিবেশ বিকেল কাটানোর জন্য বাড়তি আকর্ষণ। হিজল বনের ভেতর দিয়ে আখড়ায় পৌঁছানোর পথটিও যেন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক আলাদা রোমাঞ্চ।
দিল্লির আখড়ায় ঘুরতে আসা পর্যটক জুয়েল মিয়া বলেন, `মিঠামইনের হাওড়ের বুকে এই জায়গাটি যেন রহস্যে ঘেরা এক মায়াবী দ্বীপ। এখানে এলেই ইতিহাস, প্রকৃতি আর আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিশেল অনুভব করা যায়।’
আরেক দর্শনার্থী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘চারদিকে জলরাশির মাঝখানে হিজল গাছের সারি দেখে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই যেন এখানে শিল্প এঁকেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে এটি দেশের অন্যতম সেরা পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে।’
স্থানীয় লোকঐতিহ্য গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ রওশন আলী বলেন,‘দিল্লির আখড়া শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের কেন্দ্র নয়, এটি বাঙালির শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোককথার এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।’
তিনি এ স্থানের যাতায়াতব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানান।
প্রকৃতি, লোককথা, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে ‘দিল্লির আখড়া’ এখন কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং হাওরাঞ্চলের সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য। উপযুক্ত পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এটি জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








