বাংলাদেশের কৃষি হবে আরও টেকসই, জলবায়ু সহনশীল, উদ্ভাবনভিত্তিক, বাজারমুখী এবং অধিক উৎপাদনশীল। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে ২৫ বছর মেয়াদি একটি দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনামূলক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
‘ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০’ শীর্ষক এই রোডম্যাপ শুধু উৎপাদন বাড়ানোর কৌশল নয়- বরং দেশের পুষ্টি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত জাতীয় কর্মশালায় মহাপরিকল্পনার খসড়া উপস্থাপন করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) যৌথভাবে এই কর্মশালাটি আয়োজন করে।
এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কৃষিকে ১৩টি থিম্যাটিক এরিয়ায় ভাগ করে গভীর ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- পুষ্টি নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা, কৃষি মূল্য সংযোজন, কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনা, ভর্তুকি, যান্ত্রিকীকরণ, কোল্ড চেইন, গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ), স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) কমপ্লায়েন্সসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রতিটি থিমের জন্য বিস্তারিত কৌশল এবং লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিটি থিমেটিক এরিয়ার ক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ, প্রবণতা মূল্যায়ন এবং ২০৫০ সাল পর্যন্ত চাহিদা–সরবরাহ পূর্বাভাসের ভিত্তিতে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশের সব ১৪টি কৃষি অঞ্চলে আঞ্চলিক পরামর্শ সভা আয়োজন করা হয়, যাতে কৃষি-প্রাকৃতিক অঞ্চল, চাষাবাদ পদ্ধতি ও বাজার বাস্তবতার প্রতিফলন নিশ্চিত করা যায়। এসব পরামর্শে কৃষকসহ বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণে আঞ্চলিক অগ্রাধিকার, বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জ ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা চিহ্নিত হয়েছে।
এ পরিকল্পনাকে সাতটি অধ্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এতে প্রেক্ষাপট ও প্রণয়ন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কৃষি খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সহায়ক নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, ১৩টি থিমেটিক এরিয়ার গবেষণার সমন্বিত ফলাফল, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। এতে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও অভিযোজন নিশ্চিত করতে মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে কর্মশালায় জানানো হয়। এফএও ও ইউএনডিপি এই ব্যাকগ্রাউন্ড স্টাডিগুলোতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছে।
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কৃষি উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, এটি বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ গঠনের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আগামী ২৫ বছরে কৃষির রূপান্তর দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন শুধু কৃষি খাত নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কর্মশালায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান নয়, বরং আগামী ২৫ বছর—বিশেষ করে ২০৫০ সাল পর্যন্ত—কৃষি খাতকে কোথায় দেখতে চাই, সেই ভিশন বাস্তবায়ন করা। তিনি বলেন, ২০৫০ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব ধরে মানুষের খাদ্য চাহিদার পাশাপাশি পশু-পাখি ও বন্যপ্রাণীর খাদ্য চাহিদাকেও সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি নন-হিউম্যান কনজাম্পশন হিসাব করে নিট চাহিদা নির্ধারণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলেন তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মাহমুদুর রহমান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের কৃষি রূপান্তরের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু নোমান ফারুক আহম্মেদ তাঁর উপস্থাপনায় জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) ও স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ লাখ হেক্টর জমিকে গ্যাপ সার্টিফিকেশনের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে ৭০ শতাংশ জমিতে আইপিএম ও জৈবিক বালাইনাশক ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় মৃত্তিকা জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও অম্লত্ব সংশোধন এবং ডিজিটাল সয়েল হেলথ কার্ড চালুর কথাও বলা হয়।
মহাপরিকল্পনায় রপ্তানি বাড়াতে প্রস্তাব করা হয়েছে একটি স্বতন্ত্র ন্যাশনাল প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন অথরিটি গঠন, বাংলাদেশগ্যাপকে গ্লোবালগ্যাপের সঙ্গে সমন্বয় এবং ব্লকচেইনভিত্তিক ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম চালু করার। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২০৫০ সাল নাগাদ উদ্যানজাত ফসলের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলার এবং মোট কৃষিপণ্য রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
থিম্যাটিক এরিয়া ৪ (ভর্তুকি), ৬ (যান্ত্রিকীকরণ) ও ৮ (কোল্ড চেইন) নিয়ে সমন্বিত উপস্থাপনায় জানানো হয়, দেশে বর্তমানে চাষাবাদ ও সেচ কার্যক্রমের প্রায় ৯৫ শতাংশ যান্ত্রিকীকৃত হলেও রোপণ, শুকানো ও আগাছা দমন কার্যক্রমে যান্ত্রিকীকরণ এখনো ৫ শতাংশের নিচে।
কৃষি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলন তার প্রবন্ধে বলেছেন, গত চার দশকে দেশে তাপমাত্রা গড়ে প্রতি দশকে প্রায় ০.২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। ভবিষ্যতে দিন ও রাতের তাপমাত্রা আরও বাড়বে, বিশেষ করে গরম রাতের সংখ্যা বৃদ্ধি ধানসহ প্রধান ফসলের ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অভিযোজন ব্যবস্থা না নিলে ধানের ফলন ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হবে, বন্যা ও খরার ঝুঁকি বাড়বে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বিস্তৃত হবে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় ক্লাইমেট স্মার্ট এগ্রিকালচার প্রযুক্তি যেমন এডব্লিউডি সেচ পদ্ধতি, যান্ত্রিক ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট, স্বল্পমেয়াদি ও স্ট্রেস-সহনশীল জাত এবং ডাইরেক্ট সিডেড রাইস ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অধ্যাপক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম তার উপস্থাপনায় জানান, ২০৫০ সালে হেক্টরপ্রতি কৃষিশক্তি প্রাপ্যতা ৫.১৯ কিলোওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যেখানে বর্তমানে এটি ৩.২৪ কিলোওয়াট/হেক্টর। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী ২৫ বছরে প্রায় ৪৪ হাজার মিলিয়ন টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
কোল্ড চেইনের ক্ষেত্রে বর্তমানে দেশে ৩৯৩টি কোল্ড স্টোরেজ থাকলেও সেগুলোর বেশির ভাগই আলু সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ২৫ বছরের মহাপরিকল্পনায় ফল ও সবজির জন্য কৃষক-কেন্দ্রিক সমন্বিত কোল্ড চেইন ও লজিস্টিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। যাতে পণ্যের অপচয় কমে এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়।
কর্মশালায় পরিকল্পনা কমিশন, এফএও, ইউএনডিপি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কূটনীতিক, গবেষক, উদ্যোক্তা, কৃষক প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মতামত ও সুপারিশ দেন, যা আউটলুক ২০৫০ এর চূড়ান্ত রোডম্যাপকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষি খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়বে।








