উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা শীতকালীন সবজির ভরা মৌসুমের (নভেম্বর-জানুয়ারি) আগেই ফসল তুলে বেশি লাভের আশায় আগাম চাষে ঝুঁকছেন। সাধারণত ভরা মৌসুমে সবজির আমদানি বেড়ে যাওয়ায় ন্যায্যমূল্য পান না কৃষকরা।
এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় এবং আগে ফসল বাজারে তুলতে পারলে চড়া দাম ও বেশি চাহিদা থাকার কারণে তারা এই কৌশল গ্রহণ করেছেন।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে মাঠজুড়ে শোভা পাচ্ছে শিম, মুলা, ফুলকপি, গাজর, বাঁধাকপি, বেগুন, করলা, কাঁকরোল, লাউ, লালশাক, ধনিয়া পাতা, টমেটো, শসা, পালংশাক এবং বরবটির মতো নানা ধরনের সবজি। কিছু আগাম সবজি এরই মধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে। আমদানি কম থাকায় বর্তমানে এসব সবজির দাম বেশ চড়া, ফলে কৃষকরা ভালো লাভ পাচ্ছেন। কৃষকরা এখন উঁচু জমিতে চারা রোপণ ও পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
রংপুর জেলার পীরগঞ্জের কৃষক মাজেদুল বলেন, ‘এ বছর ৩০ শতক জমিতে শিম চাষের জন্য তৈরি করেছি। কয়েক দিনের মধ্যে জমিতে রোপন করবো।’
তিনি আরো বলেন, ‘আগাম শীত মৌসুমের জন্য যেসব সবজি চাষ করা হয় তার দাম ভালোই পাওয়া যায়। কিন্তু পরিচর্যা বেশি করতে হয়। পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়। আবার বৃষ্টি হলে চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে ভালো দামের আশায় আগাম সব সবজি চাষ করা হয়।’
মাটিয়াল পাড়া গ্রামের সবজি চাষি সিদ্দিক আলী বলেন, ‘দেড় বিঘা জমিতে আগাম সবজি চাষ করেছি। এ বছর বৃষ্টি কম থাকায় আগাম সবজি চাষে কিছুটা সমস্যা হয় নাই। তবে, অনেক খরচ পড়ছে।’
‘অসময়ে বাজারে এই সবজির চাহিদা থাকে অনেক। এ কারণে এই সবজিগুলো বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা যায়। এ জন্য আগাম শীতকালীন সবজি চাষে আমাদের আগ্রহ বেশি থাকে, বলেও জানান তিনি।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর, আলাদীপুর, খয়েরবাড়ী, দৌলতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সেপ্টেম্বর মাস থেকে আগাম শীতকালীন সবজির চাষ পুরোদমে শুরু হয়েছে।
আলাদীপুর ইউনিয়নের ছোট ভিমলপুর গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম ৩৫ শতাংশ জমিতে আগাম জাতের কপি চাষ করেছেন। তার আশা, খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা হলেও গত বছরের মতো এবারও ভালো লাভ হবে।
তিনি গত বছর এই জমিতে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার কপি বিক্রি করেছিলেন। একই গ্রামের কৃষক আলামিন হোসেন ৮০ শতাংশ জমিতে ফুলকপির চারা রোপণ করেছেন এবং মৌসুমের শুরুতে বাজারে তুলতে পারলে দাম বেশি পাওয়া যায়—এই আশায় বুক বাঁধছেন।
পৌর এলাকার উত্তর কৃষ্ণপুর গ্রামের মশিউর ৩০ শতাংশ জমিতে কপি আবাদ করেছেন, যা ২৫ দিনের মধ্যেই বাজারে তোলার আশা করছেন।
ফুলবাড়ি উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুসারে, চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে আগাম জাতের সবজির লক্ষ্যমাত্রা ৬৫০ হেক্টর। এ ছাড়া আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ৮১০ হেক্টর।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা শাহানুর রহমানও মনে করেন আগাম সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় চাষিরা এই দিকে ঝুঁকছেন। এখানকার সবজি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। কৃষি বিভাগ আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও রোগবালাই দূরীকরণে চাষিদের সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, কৃষকরা আগাম শীতকালীন বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ শুরু করেছেন। আগাম শীতকালীন সবজি চাষে একটু ঝুঁকি বেশি থাকে। এজন্য কৃষকদের সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে সুষম সার, জৈব সার এবং কীটনাশকের সঠিক ব্যবহারের জন্য মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।









