দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে ঢাকা শহরে পার্ক, পুকুর, ও প্লেগ্রাউন্ড (৩পিজি) ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা নগরের পরিবেশগত ভারসাম্য, জনস্বাস্থ্য এবং শিশু ও যুবদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবুজ উন্মুক্ত স্থান ও জলাধার সংকুচিত হওয়ার ফলে নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বায়ুদূষণ ও জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সোমবার সকাল ১১টা থেকে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে পরিবেশগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ শীর্ষক একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস), গিফট ফর গুড এবং স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ -এর যৌথ উদ্যোগে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।
ক্যাপস-এর চেয়ারম্যান এবং স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার তার বক্তব্যে বলেন, ঢাকা শহরের পরিবেশগত সংকট মোকাবেলায় ৩পিজি সংরক্ষণ এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কোথায় কীভাবে কাজ করতে হবে, কোন সূচকের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন এবং কীভাবে স্থানিক-কালিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সময়ের সাথে পরিবর্তন শনাক্ত করা যায় এসব বিষয়ে একটি বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নগরের পরিবেশগত সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাহমুদা পারভীন তার বক্তব্যে বলেন, একটি সুস্থ, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে পার্ক,পুকুরের ও প্লেগ্রাউন্ড এর কোনো বিকল্প নেই। পার্ক নগরের ফুসফুস হিসেবে কাজ করে, নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, মানসিক প্রশান্তি দেয় এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। প্লেগ্রাউন্ড শিশু ও যুবদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, আর পুকুর ও জলাধার নগরের প্রাকৃতিক জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, ৩পিজি সংরক্ষণ একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, যেখানে গবেষণা, নীতিনির্ধারণ, প্রযুক্তি এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ একসাথে কাজ করতে হবে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ-এর পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহমুদা ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, এই ধরনের বাস্তবমুখী ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ তরুণদের দক্ষতা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বৃদ্ধি করে। কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, মাঠ পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাই একজন তরুণকে ভবিষ্যতের পরিবেশ গবেষক ও পরিবেশকর্মী হিসেবে গড়ে তোলে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা ঢাকা শহরের পার্ক, পুকুর, প্লেগ্রাউন্ড সংরক্ষণে কার্যকর ও টেকসই ভূমিকা রাখবে।
ক্যাপস-এর লিড রিসার্চার ইঞ্জিনিয়ার মারজিয়াত রহমান তার বক্তব্যে বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর গবেষণা এবং তরুণদের সক্রিয় সম্পৃক্ততাই ৩পিজি সংরক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করতে পারে। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছাড়া কার্যকর নীতিনির্ধারণ সম্ভব নয়। পরিবেশগত ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই নগরের পরিবেশ রক্ষায় বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।
গিফট ফর গুড-এর প্রতিনিধি জুবায়ের ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, পার্ক, পুকুর ও প্লেগ্রাউন্ড সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ক্যাপস-এর গবেষণা সহকারী মোঃ মাকসুদুর রহমান একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন প্রদান করেন। তিনি আধুনিক ডিজিটাল টুল ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে স্পেশিও-টেম্পোরাল ডাটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং উপস্থাপন করা যায় তা তুলে ধরেন। জিআইএস, ম্যাপিং ও ডেটা ভিজুয়ালাইজেশনের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের তথ্য কীভাবে গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় সে বিষয়ে তিনি অংশগ্রহণকারীদের বাস্তব ধারণা প্রদান করেন।
আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ ও যুবরা পার্ক, প্লেগ্রাউন্ড ও পুকুর সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে এবং গবেষণা, প্রযুক্তি ও নাগরিক উদ্যোগের সমন্বয়ে একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ঢাকা শহর গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।








