বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এখন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত আজ পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে, কিন্তু এর সবচেয়ে তীব্র আঘাত পড়ছে বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ওপর। তীব্র তাপদাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং খরার মতো বিপর্যয় এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা বলছে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে এবং প্যারিস চুক্তির ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বর্তমানে অনিশ্চয়তার দিকে ঝুঁকছে। অথচ বাংলাদেশ বিশ্ব কার্বন নিঃসরণের দিক থেকে অবদান রেখেছে মাত্র ০.৩ এর মতো। তবু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের। এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বিশ্ববাসীর জন্য বিশেষ করে বাংলাদেশের মত রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিতব্য কপ৩০ সম্মেলন তেমন একটি মোড় ঘোড়ানো সম্মেলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, কারণ এখানে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বৈশ্বিক নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন ব্যবস্থা এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে আর্থ শীর্ষ সম্মেলনের পর এবারই প্রথম ব্রাজিলের সভাপতিত্বে কপ এর মত একটি বড় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের কপ৩০-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হবে বৈশ্বিক নিঃসরণ হ্রাসের স্বচ্ছ ও বাধ্যতামূলক রোডম্যাপ তৈরি করা। প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক দেশ এখনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ। উন্নত দেশগুলো বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে সবচেয়ে বেশি দায়ী হওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো যথাযথভাবে নিঃসরণ কমানোর গতি বাড়ায়নি। বহু রাষ্ট্র এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হতে পারেনি। তাই কপ৩০-এ বড় অর্থনীতি ও উচ্চ নিঃসরণকারী দেশগুলোর জন্য সময়সীমা নির্ধারণ, খাতভিত্তিক নিঃসরণ হ্রাস পরিকল্পনা, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। নিছক প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়—বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও এনার্জি ট্রানজিশন হল কপ৩০-এর আরেকটি প্রধান আলোচ্য বিষয়। বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানির সবচেয়ে বড় অংশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং অর্থায়ন মূলত উন্নত দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্রমশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে পিছিয়ে পড়ছে। তাই কপ৩০-এ জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, পরিবেশবান্ধব শিল্প সরঞ্জাম সরবরাহ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্বল্পসুদে বিনিয়োগ নিশ্চিত করার মতো সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যাশিত। বৈশ্বিক নিঃসরণ হ্রাস ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সমান সুযোগ না দিলে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন করা কখনই সম্ভব নয়।
কপ৩০-এর অন্যতম প্রধান আলোচ্য হবে লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর কাঠামো বিনির্মাণ। কপ২৮-এ এই তহবিল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলেও এর অনেক বিষয় এখনও অস্পষ্ট। কোন দেশ কত টাকা দেবে, কোন দেশ কত পাবে, কীভাবে পাবে, কীভাবে ক্ষতি যাচাই করা হবে ইত্যাদি বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ইতোমধ্যে জলবায়ুজনিত দুর্যোগে অগণিত মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা, কৃষিজমি এবং সুপেয় পানির উৎস হারিয়েছে। তাই লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডকে দ্রুতগতির, ঝামেলামুক্ত এবং উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে কার্যকর করে তোলাটা হতে পারে কপ৩০-এর শীর্ষ অর্জন। এর পাশাপাশি অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি কপ৩০-এর আরেকটি কেন্দ্রীয় বিষয়। যেসব দেশ জলবায়ু ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের জন্য ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। উপকূল সুরক্ষা, পানি সংরক্ষণ, লবণাক্ততা মোকাবিলা, সবুজ অবকাঠামো, দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি—এসব ক্ষেত্রের উন্নয়ন ছাড়া ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়। তাই অ্যাডাপটেশন ফান্ড ও গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডে বৃহৎ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ, সহজ শর্তে অর্থ গ্রহণ এবং কাঠামোগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে সম্মেলনের একটি বড় আলোচ্য বিষয়।
এ ছাড়াও কার্বন বাজার এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরও কপ৩০ সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে। অনেক দেশ কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, কিন্তু স্বচ্ছ নীতি ও মূল্যায়নের অভাবে ঝুঁকি ও অনিয়মের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই কার্বন বাজারকে জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নশীল দেশবান্ধব করার সিদ্ধান্ত গ্রহণও কপ৩০-এর জন্য গুরুত্ববহ। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত বেড়ে চলা খাদ্য সংকট, পানির ঘাটতি এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের বিষয়েও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরি নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কপ৩০ বিশেষ অর্থ বহন করে, কারণ দেশটি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি অবস্থায় থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বোঝা বেশি বহন করে চলেছে প্রায় কয়েক দশক ধরে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও খরায় প্রতি বছর বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, পানি, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব দৃশ্যমান। তাই কপ৩০-এ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দাবি হবে ন্যায্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। প্রথমত, বাংলাদেশ লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে দ্রুত ও যথাযথ অর্থপ্রাপ্তির দাবি তুলবে, কারণ দেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি দিন দিন বেড়েই চলেছে। নদীভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম হারিয়ে যাচ্ছে, উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এসব ক্ষতি মোকাবিলায় শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, টেকসই অর্থায়ন ও পরিকল্পনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধি বাংলাদেশের অন্যতম বড় চাহিদা। উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, পানি শোধনাগার, লবণাক্ততা সহনশীল ফসল আবিষ্কার, কৃষি বৈচিত্র্য ও দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থা উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করবে। দেশটি ক্রমেই সৌরবিদ্যুৎ, বায়ু শক্তি ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য এবং ক্লিন জ্বালানি ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে, তবে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির অভাব এখন বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই বাংলাদেশ প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্বল্পসুদে ঋণ, এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা চাবে। চতুর্থত, জলবায়ু উদ্বাস্তু ইস্যুকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়াও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লাখ লাখ মানুষ ইতোমধ্যে গৃহহীন হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অধিকার, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে বৈশ্বিক নীতি প্রণয়নের দাবিও বাংলাদেশ কপ৩০-এ উত্থাপন করতে পারে। বাংলাদেশ স্বচ্ছ ও ন্যায্য কার্বন বাজার নিশ্চিত করার দাবিও তুলবে, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতারণা বা জটিলতার শিকার না হয় এবং কার্বন বাণিজ্য থেকে প্রকৃত আর্থিক সুবিধা পায়।
কপ৩০ আলোচনা দুই সপ্তাহ ধরে চলবে, যেখানে আলোচনা করা হবে কিভাবে “জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়া”, বিশ্বব্যাপী বন রক্ষা করা এবং দরিদ্র দেশগুলিকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা যায়। এই বৈঠকের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখার জন্য ভবিষ্যতের একটি স্বচ্ছ পথ তৈরি করা। যদি অধিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো আরও শক্তিশালী জলবায়ু নীতি ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তবে এই শতাব্দীর শেষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ২.৫ থেকে ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেতে পারে, যা তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও তীব্র করে তুলবে। তাই কপ৩০ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এই সম্মেলন শুধু পরিবেশগত আলোচনার জায়গা নয়, বরং বাঁচার অধিকার, ন্যায্যতা এবং বৈশ্বিক দায়িত্ববোধের মত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সমাধানের স্থান। বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে কপ৩০-এ ন্যায়বিচার, অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষতিপূরণের দাবিকে শক্তভাবে উপস্থাপন করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের দায় উন্নয়নশীল দেশের নয়, কিন্তু ক্ষতির বোঝা তাদের ওপরেই বেশি। তাই কপ৩০-এ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা এবং সমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক সহযোগিতার নতুন দিগন্ত খুলে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশসহ সমগ্র ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব।
অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার, ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)।








