বরগুনার তালতলী উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের সওদাগর পাড়া গ্রামে এক সময় লবণাক্ততার কারণে শুধু বর্ষা মৌসুমে ধানের চাষাবাদ হতো। এখন সেখানে বছরব্যাপী নানা ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। এখন এই গ্রামটি পরিচিত সবজি গ্রাম নামে। গ্রামের প্রতিটি পরিবারই সবজি চাষের উপর নির্ভরশীল। আর এখানকার সবজি চলে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তবে স্থানীয়রা বলছেন, রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকরা।
কৃষকরা জানান, শুধু বর্ষা মৌসুমে ধানচাষ করে তেমন লাভ হতো না। ১০ বছর আগে শাহাদাত মাতুব্বর নামে এক কৃষক সবজি চাষে সফলতা পান। তার সাফল্য দেখে ধীরে ধীরে গ্রামের অন্যান্য কৃষক পরিবারও সবজি চাষের পথে হাঁটে। এখন বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করেন তারা। এ গ্রামে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়, যা থেকে বছরে প্রায় ৬ কোটি টাকার সবজি উৎপাদন হয়।
উপকূলীয় জেলা বরগুনার তালতলীর সওদাগরপাড়া গ্রামের দুইদিকে পায়রা ও আন্ধারমানিক নদী অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর। নদী থেকে গ্রামে ঢোকা খালগুলো দিয়ে লবণাক্ত পানি মাটিতে মিশে যাওয়ার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় এই গ্রামের জমি অনাবাদি থাকত। বছরে শুধু আমন ধান ফলাতেন কৃষকরা। কিন্তু এখন সেই জমিতে ক্ষেতর পর ক্ষেতজুড়ে শুধু সবজি বাগান। মাঠে মাঠে শোভা পাচ্ছে সারি সারি লাউ, শিম, মরিচ, মুলা, বেগুন, বরবটি, কুমড়াসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। এসব ফসল পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন এই গ্রামের চাষিরা। এখানকার উৎপাদিত সবজির মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এতে বেকারত্ব দূর হওয়ার পাশাপাশি এসেছে অর্থনৈতিক উন্নতি। তবে চাষিদের অভিযোগ, রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগব্যবস্থা একদম নাজুক থাকায় সবজির ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
সরজমিনে দেখা গেছে, লবণাক্ততা কাটিয়ে সবুজে ভরে উঠেছে মাঠ। শিম, মরিচ, করলা, মুলা, বেগুন, কুমড়া, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হচ্ছে এখানে।
সওদাগরপাড়া গ্রামের কৃষক মিজান পঞ্চায়েত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক সময় গ্রামের নারীরা কাজ করতেন না। তখন শুধু ধান চাষ হতো। সে সময় বেশির ভাগ পরিবারে ছিল অভাব-অনটন। এখন এ গ্রামে বছরজুড়ে সবজি চাষের কারণে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে কাজ করেন। এতে অভাব দূর হয়েছে চাষীদের।’
কৃষক হেলাল মিয়া বলেন, ‘আগে জমিতে ধান চাষ করতাম। তবে লবণাক্ততার কারণে তেমন ফলন হতো না। সাগরের পানি প্রবেশের পথ বন্ধ হওয়ায় ধীরে ধীরে লবণাক্ততা কেটে গেছে। এখন সবজি চাষ করছি। চলতি মৌসুমে এক বিঘা জমিতে শিম ও মরিচ চাষ করেছি। এতে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বিক্রি করেছি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।’
সবজি চাষী জুয়েল মিয়া বলেন, ‘চলতি মৌসুমে তিন বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেছি। এতে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪ লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেছি। তবে সার, কীটনাশক ও বীজের দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। এতে করে চাষের খরচ বেড়ে গেছে। তবে বাজারদর ও ফলন ভালো হওয়ায় খরচ বাদ দিয়ে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।’
লবণাক্ততার কারণে এক সময় এই এলাকার অধিকাংশ জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। অল্প কিছু জমিতে বছরে একবার ধান চাষ হতো। কিন্তু এখন সেই জমিতে বছরজুড়ে উৎপাদন হচ্ছে নানা ধরনের সবজি। সবজির ফলন লাভজনক হওয়ায় এখন এই গ্রামের সবাই সবজি চাষের উপর নির্ভরশীল। তবে রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ থাকায় সবজির ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। তাই আমাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সবজি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য একটি বাজারের ব্যবস্থা করে দিলে ন্যায্য মূল্যে সবজি বিক্র করতে পারতাম। তালতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ইলিয়াস বলেন, কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সবজি ক্রয়-বিক্রয়ের সমস্যার সমাধান করার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা। সওদাগরপাড়া গ্রামে ৩০০ একর জমিতে সবজি আবাদ করে সংসার চলে তিন শতাধিক পরিবারের।








