রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এ বছর বিপুল পরিমাণ জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও কম রোগবালাইয়ের কারণে ফলনও ভালো হয়েছে।
তেমনি গাইবান্ধার চরাঞ্চলে মিষ্টি কুমড়ার ব্যাপক ফলন হয়েছে। খরচ কম ও ফলও হয়েছে ভালো। প্রতিদিন জমি থেকে মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করে অন্তত ৭ হাজার পরিবার তাদের প্রতিদিনের সংসার খরচ মেটাতে পারছেন। উৎপাদিত মিষ্টি কুমড়া গাইবান্ধার বাজার মিটিয়েও ট্রাকে ভর্তি করে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয়রা জানায়, যুগের পর যুগ এইঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমি পতিত ছিল। এসব জমিতে বর্ষায় থৈ থৈ পানি থাকে। শুকনো মৌসুমে পরিণত হয় গোচারণ ভূমিতে। এমন দৃশ্য এলাকাবাসীর কাছে চির চেনা। কিন্তু ক’বছর ধরে ঘটেছে ব্যতিক্রম ঘটনা। কৃষি বিভাগের আবাদের আওতায় আনা হয়েছে এসব জমি। এখন বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘন সবুজের সমারোহ। মিষ্টি কুমড়ার পাশাপাশি ফলছে বাদাম, ক্ষিরা, সূর্যমুখী, সরিষাসহ অনেক জাতের শাক-সবজি। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় শতাধিক বেকার যুবকের। এক খণ্ড জমিতে চাষাবাদ করে দশগুণ লাভ করছেন চাষিরা।
কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চরাঞ্চলের বালুময় জমিতে শীতকালীন সবজি হিসেবে মিষ্টি কুমড়ার চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কম খরচে বেশি উৎপাদনের আশায় কৃষকরা প্রতি বছরই এ ফসলের আবাদ বাড়াচ্ছেন। উৎপাদন বেশি এবং বাজারে আলুর দাম কম থাকায় মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যান্য সবজির দামও কমে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার টন। প্রায় ৯২ শতাংশ মিষ্টি কুমড়া চাষ হচ্ছে চরাঞ্চলে। অনেক কৃষক সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করছেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ বলছে, হেক্টরপ্রতি মিষ্টি কুমড়া উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১০ হাজার পিস। হেক্টরে ৩০ মেট্রিক টন উৎপাদন হারে ১১ হাজার হেক্টরে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন ফলন হয়েছে।
চরাঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। ভালো ফলন হলে এক বিঘা জমিতে ৬০ থেকে ৮০ মণ পর্যন্ত কুমড়া পাওয়া যায়।
গাইবান্ধার কামারজানি বন্দরের বাসিন্দা মিষ্টি কুমড়া চাষি আব্দুর রশিদ জানায়, গাইবান্ধা সদর, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ বালুচরজুড়ে চাষ হয়েছে বিট কুমড়া ও স্থানীয় নানান জাতের মিষ্টি কুমড়া। চর হরিচন্ডি, চরমানিককর, গোঘাট, কড়াইবাড়ি, লালচামার, পোড়ারচর , শ্রীপুর, বেলকা, হরিপুর, ভরতখালী, কুন্দেরপাড়ার চর, চর সিদাই, চর হলদিয়া, উড়িয়াসহ বালুচরের আধুনিক উপায়ে এই মিষ্টি কুমড়ার চারা লাগান কৃষকরা।
বালুচরে গর্ত খুঁড়ে বালুর গভীরে বীজ বপন করা হয়। তারপর চারা বড় হলে বালুচরজুড়ে গাছের ডালপালা ছড়িয়ে দিতে হয়। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হয় মিষ্টি কুমড়ার ফলন। ডিসেম্বর শেষ দিকে মিষ্টি কুমড়ার বাজারে বিক্রি হতে শুরু করে।
জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বালুচরের নাম ধুতিচোরা। এই ধুতিচোরা গ্রামের আফসার মোল্লাহ। নদ ভেঙে পরিবার পরিজন নিয়ে ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পশ্চিম তীরে বাস করছেন পরিবার পরিজন নিয়ে। কিন্তু নদে জেগে ওঠা বালুচর। এই বালুচরে সেচ দিয়ে ৯ বিঘা জমিতে চাষ করেছে মিষ্টি কুমড়া । এবার মিষ্টি কুমড়ার ফলনও হয়েছে ভালো। খরচ কম কিন্তু লাভ বেশি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা নদীর চর কালমাটি এলাকার কৃষক তমিজ উদ্দিন জানান, ‘এবার কুমড়ার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু পাইকাররা কম দামে কিনতে চাইছে। তাতে খরচ উঠানোই কঠিন হয়ে যাবে।’ ‘আমি আশা করেছিলাম গেল বছরের তুলনায় এবছর দাম বেশি পাবো কিন্তু আগের তুলনায় দাম কমেছে অনেক, কিন্ত কিছুদিন পর দাম বাড়বে বলে জানান তিনি।
তমিজ উদ্দিন তিস্তা নদীর চরে ২০ বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা। এবছর ফলন পেয়েছেন আশাসুনুপ। প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ৭০ মণ কুমড়ার ফলন পেয়েছেন।
কৃষকরা দাবি করছেন, সরকারিভাবে সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা হলে তারা উৎপাদিত মিষ্টি কুমাড়র ন্যায্য দাম পেতে পারেন।
রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন হাটবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি কেজি মিষ্টি কুমড়া ৮ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে দাম আরও কম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে আলুর দাম কম। আলু প্রতি কেজি ১০ থেকে ১৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলু সহজলভ্য হওয়ায় ক্রেতারা অন্যান্য সবজির তুলনায় আলু বেশি কিনছেন। এর প্রভাব পড়েছে মিষ্টি কুমড়া, লাউ, কচু, মিষ্টি আলুসহ অন্যান্য সবজির দামে।
রংপুর নগরীর পৌর বাজারে পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আলুর দাম কম থাকলে মানুষ আলুই বেশি কিনে। তখন অন্য সবজির চাহিদা কমে যায়। তাই কুমড়ার দামও কম।‘আলুর দাম চড়া থাকলে ক্রেতারা অন্যন্য সবজির দিকে ঝুঁকে পড়েন। এতে মিষ্টি কুমড়াসহ সকল ধরনের সবজির দামও বাড়ে। কৃষকরা এতে লাভবান হন।’
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, চরাঞ্চলের মাটি মিষ্টি কুমড়া চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় কৃষকরা বেশি করে চাষ করছেন। এবছর উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। ফলে দাম কিছুটা কমেছে। এছাড়া বাজারে আলুর দাম তুলনামুলক কম হওয়ায় এর প্রভাবও পড়েছে মিষ্টি কুমড়াসহ অন্যন্য সবজির দামের ওপর। ‘বাজারে দাম কম হলেও চরের চাষিরা মিষ্টি কুমড়া চাষে লাভবান। গেল কয়েক বছলধরে মিষ্টি কুমড়া চাষ চরের কৃষি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে।








