রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলজুড়ে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস ও দিনের পর দিন সূর্যের দেখা কম মেলায় চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। পাশাপাশি কয়েক দিনের কনকনে শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছে মানুষ ও গবাদিপশু। এ অবস্থায় গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা।
রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া রংপুরে ৯ দশমিক ৬, তেঁতুলিয়ায় ৬ দশমিক ৯, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯ দশমিক ৪, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৯, লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৩, নীলফামারীর ডিমলায় ৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ দশমিক ৯ এবং গাইবান্ধায় ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা সহজে কাটছে না, ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে।
শনিবার সকাল ৯টায় জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে। এদিকে আগের দিন সন্ধ্যা থেকে পরদিন পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে পথঘাট। সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ, দিনমজুর ও ক্ষেতমজুররা।
গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, কনকনে শীতে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। অধিকাংশ গৃহস্থই গরু ও ছাগলকে ঘরের ভেতরে বেঁধে রেখেছেন। অনেকেই পুরনো বস্তা, চট কিংবা পলিথিন দিয়ে গবাদিপশু ঢেকে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ঘন কুয়াশা ও শিশিরে সেগুলো ভিজে যাওয়ায় পশুগুলোকে ঠিকমতো ঢেকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ঠাণ্ডায় অনেক গবাদিপশু কাহিল হয়ে পড়ছে, কিছু কিছু পশুর মধ্যে সর্দি, জ্বরসহ বিভিন্ন রোগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ঠাণ্ডার কারণে পশু চরাতে না পারায় খাদ্য সংকটও দেখা দিয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে দুটি ছাগলছানা নিয়ে উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন উপজেলার সদর চেংমারী এলাকার গৃহিণী জমিলা খাতুন (৫০)। তিনি জানান, ছাগলছানাগুলোর বয়স প্রায় ২০ দিন। তীব্র শীতের কারণে ছাগলছানাগুলো জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছে। ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে তারা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা না করালে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। জমিলা খাতুন বলেন, এই ছাগলছানাই আমাদের পরিবারের বাড়তি আয়ের ভরসা। শীতের মধ্যে যদি ওগুলোর কিছু হয়, তাহলে বড় ক্ষতিতে পড়তে হবে।
উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের বৈরাতী এলাকার বাসিন্দা সুজা মিয়া (৫৮) বলেন, গরু-ছাগলই আমাদের সংসারের সম্বল। শীতের রাতে ওগুলোর পাশে বসে থাকি। বস্তা দিয়ে ঢেকে দিই, কিন্তু ভোরে দেখি ভিজে গেছে। তখন আবার খুলে ফেলতে হয়। তীব্র ঠাণ্ডায় পশুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চর ইশোকুল এলাকার বাসিন্দা জয়তুন্নেসা বেওয়া (৫৫) বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার দুটি গরু ও তিনটি ছাগল আমার বাঁচার ভরসা। এই শীতে ওগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি সারাক্ষণ। ঠাণ্ডা লাগলে যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমি একেবারে পথে বসব।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাহফুজার রহমান বলেন, শীতকালে গবাদিপশুর পরিচর্যা ও নিরাপদে রাখার বিষয়ে খামারি ও পশুর মালিকদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে সার্বিকভাবে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. শেখ এম এ মতিন বলেন, এখন আবহাওয়ায় কুয়াশা ও বেশি মাত্রায় শীত পড়ছে। গবাদিপশু ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধিতে যেন আক্রান্ত না হয় সেদিকে গৃহস্থদের খেয়াল রাখতে হবে। গোয়ালঘরের বেড়া কাপড়ে ঘিরে রাখা, মেঝেতে শুকনো খড় বিছানো ও গরুর গায়ে চট কিংবা গরম কাপড়ে জড়িয়ে রাখতে হবে। বাছুর গরুর গায়ে সব সময় গরম কাপড় পরিয়ে রাখতে হবে। গরুর খাদ্যের জোগান পুরোদমে রাখা ও হালকা গরম পানি খাওয়ানো হলে রোগবালাই সহজে হবে না। এছাড়া কুয়াশা থাকলে গরু-ছাগল বের না করার বিষয় জানিয়েছেন।








